রবিবার, ২৬শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি/ সাগরে যাচ্ছে না ফিশিং বোট, চাপ পড়বে মাছের দামে

নিজস্ব প্রতিবেদক

# আট মাসের ব্যবধানে জ্বালানি খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ

# বাড়বে মাছের দাম, ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ভোক্তারা

# সাগরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলো

দেশের মোট চাহিদার বড় একটি অংশের যোগান দেয় সামুদ্রিক মাছ। হঠাৎ ডিজেলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ায় খরচ বাড়বে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে। যার প্রভাব পড়বে মাছের দামে। রাতে ডিজেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার পর শনিবার (৬ আগস্ট) সকাল থেকেই সাগরে মাছ শিকারে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলো। ফিশিং সেক্টরের পাশাপাশি এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার উপর।

ফিশিং শিল্পে জড়িতরা বলছেন, আট মাসের ব্যবধানে দুবার ডিজেলের দাম বেড়েছে। ৬৫ টাকার ডিজেল আট মাসের ব্যবধানে ১১৪ টাকা হয়েছে। এটা ফিশিং সেক্টরের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। কারণ সামুদ্রিক মৎস্য শিকারে ব্যবহৃত নৌযানগুলোর বেশি ব্যয় হয় জ্বালানিতে। এখন ফিশিংয়ের ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। বাড়বে মাছের দামও। এতে এ শিল্পের জড়িতদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ভোক্তারাও।মেরিন হোয়াইট ফিশ ট্রলারস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি ছৈয়দ আহমেদ বলেন, আমাদের স্টিল বডি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর প্রতিট্রিপে সাগরে মাছ শিকারে যেতে ৬০ থেকে ৮০ টন পর্যন্ত ডিজেল নিতে হয়। ১৮শ হর্স পাওয়ারের ট্রলারগুলোতে ১০০ টনের মতো ডিজেল লাগে। এখন ৮০ টাকার ডিজেল ১১৪ টাকা হয়েছে। এতে যাদের ১০০ টন তেল লাগে, তাদের প্রায় ৩৪ লাখ টাকা এক ট্রিপেই খরচ বেড়ে গেছে। সেই হিসাবে বাজারে মাছের দাম পাওয়া যাবে না। আবার মাছের দাম বাড়লেও তা সাধারণ ভোক্তাদের উপর প্রভাব পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘ফিশিং সেক্টরে জ্বালানি খরচটাই মুখ্য। আগে কখনো এই হারে জ্বালানির দাম বাড়েনি। এখন ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এতে ফিশিং সেক্টর মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।’মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিমি এলাকাজুড়ে বাংলাদেশের সীমানায় মৎস্য শিকার করে প্রায় ৬৮ হাজার নৌযান। এর মধ্যে প্রায় ৩৩ হাজার নৌযান রয়েছে ইঞ্জিনচালিত। এসব নৌযানের মাধ্যমে বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়, যা আহরিত সামুদ্রিক মৎস্যের ৮১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

মেরিন হোয়াইট ফিশ ট্রলারস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সাগরে মাছ শিকারে নিয়োজিত নৌযানের মধ্যে ২৫২টি বাণিজ্যিক ট্রলার রয়েছে। যেগুলোর মধ্যে ১৯০ স্টিলবডি ট্রলিং (বাণিজ্যিক ট্রলার), ৬০টি মতো কাঠবডি ট্রলিং রয়েছে। তাছাড়া ইলিশ ও ম্যাকানাইজড কাঠবোট রয়েছে ৩০-৪০ হাজারের মতো।’তিনি বলেন, ‘আমাদের কাঠবডি ট্রলিংগুলো ১৪-১৫ দিনের জন্য ট্রিপে যেতে ১৬-১৭ টন ডিজেল নিয়ে যায়। ডিজেলের দাম বাড়ায় এখন প্রতি ট্রিপে শুধু জ্বালানিতেই পাঁচ লাখ টাকার বেশি খরচ বেড়ে গেছে। আবার ম্যাকানাইজ বোটগুলো ৬-৭ দিনের ট্রিপে গেলেও দুই থেকে তিন টন ডিজেল নিতে হয়। এতে ম্যাকানাইজ বোটের ক্ষেত্রেও প্রতি ট্রিপে ৭০-৮০ হাজার টাকা খরচ বেড়ে গেছে। এখন সাগরে ইলিশের মৌসুম। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায়, আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যাবে। যে কারণে শনিবার সকাল থেকে আমরা সাগরে ট্রলিং পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছি।’এসময় তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘সড়কে বাস-ট্রাক মালিকরা অবরোধ করে ভাড়া বাড়িয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে বর্ধিত ভাড়া আদায় করবেন। আমরা যারা সাগরে মাছ শিকারে যাই, তারা কার কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করবো?’বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘কোভিড শুরুর পর থেকে মেরিন ফিশারিজ শিল্পে দুর্দিন যাচ্ছে। আগে বছরে ১২ মাস আমরা মাছ শিকার করতাম। এখন ইলিশ প্রজনন, ফিডিং এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ছয় মাস মাছ শিকার করা যায় না। বছরে ছয় মাস আমরা সাগরে ফিশিং করি। অথচ ব্যাংক লোনের সুদ দিতে হয় ১২ মাসের হিসাবে।

’তিনি বলেন, ‘ফিশিং সেক্টরে বড় তিনটি খরচ রয়েছে। জ্বালানি, মেনটেন্যান্স ও নাবিকদের বেতন। গত আট মাসের ব্যবধানে শুধু জ্বালানি খরচই প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ২০-২২ দিনের জন্য সাগরে যায়। গত নভেম্বর মাসের শুরুতে যখন ডিজেল ৬৪ টাকা ছিল, তখন আমাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে এক ভয়েজে ৫২ লাখ টাকার তেল লাগতো। যখন ৪ নভেম্বর থেকে ডিজেল ৮০ টাকা করা হয়, তখন ৭২ লাখ টাকা তেল লাগতো। এখন ১১৪ টাকা করায় এক ভয়েজে এক কোটি ৫ লাখ টাকার তেল লাগবে। এতে মাছ শিকারের খরচও দ্বিগুণ হয়ে যাবে। বাজারে মাছের দামও বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।’‘বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়। মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর বিদেশ থেকে মাংস আমদানি বন্ধ করে দেয় সরকার। কিন্তু মাছ আমদানি বন্ধ করেনি। এটি দেশীয় ফিশিং সেক্টরে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’র মতো। এ অবস্থা চলতে থাকলে ফিশিং সেক্টরের বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে এই সেক্টর দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষঃ