সোমবার, ১৫ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন: আইপিডি

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার কেশবপুরে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন ও পরবর্তী বিস্ফোরণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি এই ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ হতাহতদের ঘটনায় গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।

কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকান্ড, বিস্ফোরণ, জীবন ও জীবিকার অপূরণীয় ক্ষতির পেছনে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের দায় আছে যেমন; তদ্রুপ এই ধরনের রাসায়নিক কনটেইনার ডিপোর যথাযথ তদারকি, ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায় ও রয়েছে বলে মনে করছে আইপিডি।

ব্যবসা, শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসমূহের অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে উঠবার পাশাপাশি নির্মাণ ও উন্নয়ন এর সময় ভবন ও কমপ্লেক্স এর মধ্যে ইমারত সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা, ব্যবহারকালীন নিরাপত্তা, অগ্নি নিরাপত্তা ও দূর্যোগকালীন প্রস্তুতির বিরাট ঘাটতি আমাদের শ্রমিক সহ সাধারণ মানুষের নিরাপদ জীবন ও জীবিকাকে মারাত্মক ঝূঁকিতে ফেলে দিয়েছে।  সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে উপর্যুপরি এই ধরনের অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ প্রভৃতি ঘটনাসমূহ রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে যার অবর্ণনীয় ক্ষতি রাষ্ট্র তথা সাধারণ জনগণের উপর ভয়ংকরভাবে নেমে এসেছে বলে মত দিয়েছে আইপিডি।

সূত্রমতে অগ্নি দূর্ঘটনার সময়, বিশেষত নিমতলী, চুড়িহাট্টা, রুপগঞ্জ হাশেম ফুডস ফ্যাক্টরীর অগ্নিকান্ডের ঘটনাসমুহের অব্যবহিত পরে রাষ্ট্র কর্তৃক এই ধরনের অগ্নিকান্ড প্রতিরোধ ও রাসায়নিক দ্রব্যাদির নিরাপদ ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে করণীয়সমূহ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারী সংস্থা ও দপ্তরসমূহের দায়-দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এটা বিস্ময়কর যে, এই ধরনের পূর্বের ঘটনাগুলোর হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতাসমূহ ধারণ করবার পর ও আমাদের এতদসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।

সীতাকুন্ডের কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনায় বিস্ফোরক অধিদপ্তর, কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, শ্রম অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন প্রত্যেকেরই উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়টি আবার ও সামনে উঠে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে যথারীতি দোষীদের আইনের আওতায় নেবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কাস্টমস সূত্রে এখন জানা যাচ্ছে, নিরাপত্তা ও যন্ত্রপাতির শর্ত পূরণ না করার কারণে ২০১৭ সালে বিএম কনটেইনার ডিপোর লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফলে বর্তমান এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর এই ডিপোটিতে এ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ খালাস ও মজুদে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপকসহ সার্বিক নিরাপত্তার  বিষয়টি স্পস্ট হয়ে উঠেছে।  একইসাথে এই ধরনের ডিপোতে ঝূঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ থাকবার বিষয়টি ফায়ার সার্ভিসের না জানা থাকবার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার চরমতর দূর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

পাশাপাশি ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাবের কারণে দেশে আইনের শাসন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই শিথিলতা দেখা যায়, যা শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের জীবনকে ভীষণভাবে বিপন্ন করে তুলেছে। আরো একটি বিষয় এখানে তাৎপর্যপূর্ণ, এই কনটেইনার ডিপোতে ইউরোপিয়ান দেশের বিনিয়োগ থাকলেও এখানে ইউরোপিয়ান মানের কাছাকাছি অগ্নি নিরাপত্তা ও দূর্যোগ ঝূঁকি প্রশমনের তেমন কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। এই অগ্নিকান্ডের পর এই ডিপোতে ফায়ার হাইড্রেন্ট না থাকবার কারণে আশেপাশের পুকুর থেকে আগুন নেভানোর জন্য পানির সংস্থান করতে হয়েছে, যা দূর্যোগ মোকাবেলাকে প্রলম্বিত করেছে।

জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ঝূঁকিপূর্ণ ব্যবহার দেশের জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা অনুযায়ী নিষিদ্ধ সত্বেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই স্থানীয় প্রশাসনের চোখের সামনেই এবং যাবতীয় আইন ও নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে এই ধরনের শিল্প-কারখানা-বিপদজনক গুদাম গড়ে উঠছে প্রতিনিয়ত।  সীতাকুণ্ডের কেশবপুরের কনটেইনার ডিপোর  বিস্ফোরণের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আশেপাশের এলাকায় যা এলাকাবাসীকে স্বাস্থ্যগত-পরিবেশগত-অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীণ করবে দীর্ঘদিন ধরে। বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ডের এই ঘটনার পর চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে অগ্নিকাণ্ডের ঝূঁকির কথা বিবেচনা করে স্মার্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আল-রাজী কেমিক্যাল কমপ্ল্যাক্স লিমিটেডের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড তৈরির কারখানা বন্ধের দাবীতে বিক্ষোভ করেছে স্থানীয় এলাকাবাসী যা অত্যন্ত যৌক্তিক। পাশাপাশি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, পুরান ঢাকায় এতসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরও এই এলাকা থেকে বিপদজনক রাসায়নিক গুদাম এখনো সরেনি।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) মনে করে, শিল্প কারখানা ও রাসায়নিক গুদান-ডিপোসমূহকে যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও নিয়মনীতির মধ্যে নিয়ে এসে শ্রমিকের জীবন ও জীবিকার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের কোন বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান প্রতিপালনে শিল্প-কারখানা, গুদাম-ডিপোসমূহকে বাধ্য করবার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নিতে হবে  সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে। সাধারণ মানুষের দারিদ্র ও সস্তা শ্রমকে উপজীব্য করে কোন প্রভাবশালী উদ্যোক্তা কিংবা গোষ্ঠী যেন মানুষের জীবনকে যেন এভাবে বিপন্ন করতে না পারে সেজন্য রাষ্ট্র ও সরকারকে আমাদের সংবিধানে প্রতিশ্রুত জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা দিতে প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। একইসাথে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এই ধরনের ঘটনায় জীবন ও জীবিকার অপূরণীয় ক্ষতির প্রতিবিধান করতে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বার্তাটা সাধারণ জনগণের কাছে স্পষ্ট করা উচিত বলে বিশ্বাস করে আইপিডি।

আইপিডি থেকে গনমাধ্যমকে পাঠানো এক লিখিত বার্তায় এসব তুলে ধরা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষঃ