মঙ্গলবার, ২৮শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু

মাহমুদ হোসেন
বাড়ী আমার বরিশালে। নৌ বা সড়ক যে পথেই রাজধানীতে আসি না কেন পদ্মা পাড়ি দেওয়ার কোন বিকল্প নাই। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার পর জীবনে প্রথম ঢাকা আসি ১৯৬৪ সালে। তখন ঢাকা-মাওয়া-ভাংগা সড়ক তৈরি হয়নি, আর ফেরীর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে নৌপথ ছাড়া সড়ক পথে কেউ ঢাকা আসার কথা চিন্তাও করত না।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ চালু হয় ১৯১৫ সালে। এরপর থেকে উত্তারবঙ্গের সাথে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজীকরণের স¦ার্থে বঙ্গবন্ধু(যমুনা) সেতুর কথা কারও মাথায় আসলেও পদ্মা সেতুর কথা কেউ ঘুর্নাক্ষরে চিন্তাও করেনি। আর করবেই বা কিভাবে? আমাজানের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় খরস্রোতা নদীর নাম পদ্মা। প্রমত্তা পদ্মা, যার অপর নাম কৃর্তিনাশা। বর্ষার প্রবল স্রোতে যার ঢেউ দেখলে হৃদয়ে থরহরি কম্প লাগে তার উপরে সেতু এটা অকল্পনীয় ব্যাপার।
স্বাধীনতার পর থেকে দক্ষিণ বঙ্গের ২১ জেলার সঙ্গে ঢাকা সহ সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় দেশের বৃহৎ একটা অংশ পিছনে পড়ে থাকার বিষয়টি প্রথম নজরে আসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। তিনি বৃহৎ এই অঞ্চলটিকে সমগ্র দেশের সাথে সড়ক পথে সংযোগ স্থাপনের জন্য খরস্রোতা পদ্মায় সেতু নির্মানের পরিকল্পনা করেন। এর ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর পদ্মা সেতু নির্মানের লক্ষ্যে তার সরকারের শেষের দিকে ২০০১ সালের ৪ঠা জুলাই তৎকালীন মাওয়া ফেরিঘাট সংলগ্ন মৎস আড়তের কাছে পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এবং সরকার পরিবর্তনে থেমে যায় সেতু প্রকল্পের কাজ। বিরোধীদল এখন নানা অপ্রাসংগিক সমালোচনা করলেও তখনকার চার দলীয় জোট সরকার এ সেতু নির্মানে কোনো কাজ করেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেতু নিয়ে ২০০৭ সালে কিছুটা কাজ করলেও তেমন একটা আগায়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এলে আবারও পদ্মা সেতু নিয়ে জোরেসোরে কার্যক্রম শুরু হয়। জমি অধিগ্রহন, ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের কাজ চলতে থাকে। বিশ^ব্যাংক, এডিবিও, জাইকাসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি হয়। কিন্তু কর্মযজ্ঞ শুরুর মাঝপথে বিশ^ব্যাংক পদ্মা সেতু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সেতুর কাজে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার। তখন সবাই ধরে নিয়েছিল এ সরকারের পক্ষে সেতু নির্মান আর সম্ভব হবে না। বিশ^ব্যাংকের বিমাতাসুলভ আচরণ, দ্বিধাদ্বন্দ আর নানা ষড়যন্ত্রে কেটে যায় প্রায় ১৩ বছর। বিশ^ব্যাংক অর্থায়ন না করলে কি আসে যায়? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বীরদর্পে এগিয়ে এলেন। বিশ^ব্যাংককে তিনি থোরাই পরোয়া করলেন। দৃঢ় মনেবল নিয়ে ঘোষণা দিলেন পদ্মা সেতু নির্মাণ হবে আমাদের নিজেদের অর্থে। শুরু হয় জনগণের বহুল প্রত্যাশিত পদ্মাসেতুর কাজ। এরই ধারাবাহিকতায় নিজস্ব অর্থায়নে ২০১৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর শনিবার মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে মূল কাজের শুভসূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সূচনালগ্নে উপস্থিত ছিলেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, এম.পি এবং বহু নেতাকর্মী। মুহুর্মহু করতালির মাধ্যমে এই শুভলগ্নকে স্বাগত জানিয়েছিলেন দেশের দূর-দূরন্ত থেকে আগত মানুষ আর স্থানীয় সর্বস্তরের জনতা। তখন থেকেই শুরু হয় বাংলার আরও একটি নবদ্বিগন্তের। ২০১৫ সালের ১২ ই ডিসেম্বর তাই দক্ষিনবঙ্গের ২১ জেলার মানুষে কাছে এক অবিস্মরণীয় দিন। দেশী-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র আর অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ই¯পাত কঠিন মনোবলের ফসল পদ্মা সেতু আজ উদ্বোধনের দ্বারপ্রন্তে। মাননীয় সেতুমন্ত্রী যথার্থ বলেছেন- “পদ্মা সেতু শেখ হাসিনার সৎ সাহসের সোনালী ফসল”। এ প্রসংঙ্গে মনে পড়ে ১৯৮৩ এর ভারতের ক্রিকেট বিশ^কাপ জয়ের কথা। সবাইকে অবাক করে ভারত ২৫শে জুন ১৯৮৩ সালে বিশ^কাপ জিতেছিলো। ভারত কেন, ক্রিকেট বিশে^র কোনো দেশ বিশ^াস করেনি যে কাপিল দেবের দল বিশ^কাপ জিতবে। ঐ বিশ^কাপ জয়ের একক কৃতিত্ব অধিনায়ক কপিল দেবের। ঠিক তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতু নির্মাণের একক কৃতিত্বের দাবিদার। তার সাথে মাননীয় সেতুমন্ত্রীও অহর্নিশ একাগ্রচিত্তে কাজ করেছেন।
মনে পড়ে ২০১৭ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ৩৭ এবং ৩৮ নং পিলারের উপর ১৫০ মিটার দৈর্ঘের প্রথম স্প্যান বসিয়ে শুরু হয় স্বপ্ন পুরনের যাত্রা। তদসময়ে প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছিলেন। তার উপস্থিতিতে প্রথম স্প্যান বসানোর জন্য সেতু মন্ত্রী কয়েকদিন অপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, পদ্মা সেতুর কাজ এক মিনিটও বিলম্ব করা যাবে না। স্প্যান বসানোর পর সেতুমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মোবাইলে সংগৃহীত আলোকচিত্র পঠিয়েছিলেন যা দেখে প্রধানমন্ত্রী তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে বুকে জড়িয়ে আনন্দের অতিসহ্যে অশ্রুপাত করেছিলেন। একেই বলে দেশপ্রেম। এটাকেই বলে দেশের উন্নয়নের নিমিত্তে গভীর দেশাত্নবোধ ও জাতীয়তাবোধ।
প্রায় ২৪ বছর আগে ১৯৯৮ সালে এ সেতুর প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। জাপানের দাতা সংস্থা জাইকা বিস্তারিত সমীক্ষার পর ২০০৪ সালে মাওয়া জাজিরা প্রান্তে সেতু নির্মানের পরামর্শ দেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালে একনেকে পদ্মা সেতু পাশ হয়। প্রথমে এ প্রকল্পের ব্যয় ছিলো ১০,১৬২ কোটি টাকা। তারপর ২০১৬ সালে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের পর ব্যয় দাড়ায় ২৮,৭৯৩ কোটি টাকায়। প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন না করে জুন ২০১৮ সালে আবারও ব্যয় বেড়ে দাড়ায় ৩০,১৯৩ কোটি টাকা।
মূল সেতুর কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। ঠিকাদার নিযুক্ত হয় চীনের চায়না মেজর ব্রীজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানী। ৪ বছরের কাজ শেষ করার শর্তে তাদের সঙ্গে ১২,১৩৩ কোটি টাকায় চুক্তি হয়। শুরুর ১ বছর না যেতেই মাওয়ায় স্থাপিত নির্মাণ মাঠের বেইজমেন্ট প্ল্যান্টসহ নির্মাণ কাজের একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ২০১৭ সালে প্রতিটি খুঁটির নীচে মাটি পরীক্ষায় ২২টি খুঁটির নিচে নরম মাটি পাওয়া যায়, যার ফলে নকশা সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়। ফেরিঘাট স্থানান্তরেও কালক্ষেপন হয়। শুরুর সময়ে প্রতিটি পিলারের নীচে ৬টি করে পাইল (মাটির গভীরে স্টিলের ভিত্তি) বসানোর পরিকল্পনা থাকলেও যুক্তরাজ্যের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নকশা সংশোধন করে ১টি করে পাইল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এ কারণে পিলার নির্মান কজে প্রায় বছর খানেক বাড়তি সময় লেগে যায়। ঠিকাদারকেও ২ বছর ৮ মাস বাড়তি সময় দেওয়া হয়।
২০১৪ সালে নদী শাসন কাজ শুরু হয়। চার বছরে কাজ শেষ করার শর্তে চীনের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করর্পোরেশনের সঙ্গে ৮৭০৮ কোটি টাকায় চুক্তি হয়। ২০১৭ সালে প্রবল স্রোতের কারণে মাওয়ায় নদীর তলদেশে গভীর খাদ তৈরি হয়। তাছাড়া মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে তীব্র ভাংগন দেখা দেয়। এতে নদী শাসনের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। এ কাজে আড়াই বছর সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সেতু চালুর পর পায়রা বন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দার ও মংলা বন্দরের সাথে রাজধানী ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আঃ কাদের জানান, পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণ কাজ করেছে চায়না মেজর ব্রীজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনষ্ট্রাকশন কোম্পানী। দুই পাড়ে সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো যৌথভাবে নির্মান করেছে আঃ মোনেম লিমেটেড ও মালোয়শিয়ার হাইওয়ে কনষ্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট। সেতুর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়াণ এক্সপ্রেসওয়ে এবং বাংলাদেশ সেনাবহিনীকে। সেতুর রেল লাইনের কাজ করেছে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড কোম্পানী।
প্রকল্পের সূত্রমতে এবং অনলাইন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় পদ্মা সেতুতে কয়েকটি বিশ^রেকর্ড সংযুক্ত হয়েছে। প্রথম রেকর্ডটি সেতুর পাইলিং সংক্রান্ত। পদ্মা সেতুর খুঁটির নিচে ১২২ মিটার (প্রায় ৪০০ ফুট) পর্যন্ত গভীরে স্টীলের পাইল বসানো হয়েছে। এসব পাইলের প্রতিটি ৩ মিটার ব্যাসার্ধের। এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও সেতু নির্মাণে এত গভীরে পাইলিং করা হয় নাই। দ্বিতীয়: পদ্মা সেতুতে ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বেয়ারিং ব্যবহৃত হয়েছে যার সক্ষমতা ১০ হাজার টন। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার সক্ষমতা করে এটি নির্মিত হয়েছে। তৃতীয়: নদী শাসনে চীনের সিনো হাইড্রো করর্পোরেশনের সাথে ১১০ কোটি ডলারে চুক্তি হয়েছিল। ইতিপূর্বে নদী শাসনে এককভাবে এত বড় দরপত্র আর হয়নি। এই সেতুর পাইলিং এবং খুঁটির কিছু অংশে অতি মিহি(মাইক্রোফাইন) সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়েছে। এই অতি মিহি সিমেন্ট অত্যন্ত টেকসই। এ ধরনের সিমেন্ট সাধারণত ব্যবহার করা হয় না। চতুর্থ রেকর্ডটি পানি প্রবাহের। নাব্যতার সময় তীব্র স্রোত নিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে প্রতি সেকেন্ডে (মাওয়া পয়েন্টে) ১ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। সারা বিশ্বে আমাজন নদী ছাড়া আর কোনো নদী দিয়ে এত বেশি পানি প্রবাহিত হয় না।
পদ্মা সেতু দ¦ারা সরাসরি উপকৃত হবেন দক্ষিণবঙ্গের প্রায় ৩ কোটি মানুষ যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক পঞ্চমাংশ। দেশের দক্ষিণ অঞ্চল থেকে ঢাকার দূরত্ব কমবে গড়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। মানুষ এবং পণ্য পরিবহনে সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে। কৃষিতে উন্নত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনমান বদলে যাবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য মতে পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশে উন্নত হবে। বিশ^ব্যাংকের মতে পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে প্রায় ১ শতাংশ। এডিবি বলছে এ সেতুর ফলে দেশের জিডিপি ১.২০ এবং অঞ্চলিক জিডিপি ৩.৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। আজ বিশ^ব্যাংক, এডিবি সুন্দর সুন্দর কথা বলছে অথচ প্রথম দিকে এরাই এ সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল। বিবিএস এর তথ্য থেকে দেখা যায় এ পরিমাণ জিডিপি বাড়লে পদ্মা সেতু দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা যুক্ত করবে। শত বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে পদ্মার দুই তীরের মধ্যে যে সেতুবন্ধন রচিত হলো সেটি আসলে ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশকেই প্রতিফলিত করে। ইতিহাসের এ স্মরণীয় দিনটিকে মাথায় রেখে প্রায় ৪ বছর আগে এ কথাটিই বলেছিলেন সেতু প্রকল্পের পরামর্শক প্যানেলের চীফ ইঞ্জিনিয়ার জাতীয় অধ্যাপক এবং আন্তজার্তিক খ্যাতি সম্পন্ন প্রকৌশলী মরহুম ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি আজ বেঁচে থাকলে যারপর নাই খুশি হতেন। আজিকার এই শুভলগ্নে আমরা তার আত্নার মাগফিরাত কামনা করি। পদ্মা সেতুকে ঘিরে দুই তীরের সিংগাপুর ও চীনের সাংহাই নগরের আদলে শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা হচ্ছে। এই সেতুকে কেন্দ্র করে পর্যটনে যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। বাংলাদেশ পদার্পন করবে এক নব-দিগন্তে। আধুনিক মানের হোটেল রিসোর্ট গড়ে উঠবে। এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। স্বপ্নের এই সেতুকে ঘিরেই আবর্তিত হবে ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশ।
পদ্মা সেতু একদিনে তো প্রশ্নই আসে না, এক যুগেও তৈরী হয়নি। অর্থ যা ই লাগুক না কেন সময় লেগেছে প্রায় দুই যুগ। এটি একটি দ্বিতল সেতু। সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার, প্রস্থ প্রায় ২২ মিটার। নদী গর্ভে ৪২ টি পিলার আছে। দুই তীরে ১২ টি করে ২৪ টি পিলারসহ মোট পিলারের সংখ্যা ৬৬টি। ৪২টি পিলারের উপর ৪১ টি স্প্যান বসানো হয়েছে। নদীগর্ভে এবং নদীতীরের ৬৬টি পিলারের উপর সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৯.৩০ কিলোমিটার। সেতুর উপর ৪১৫ টি বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হয়েছে। সেতুর নীচ তলায় ট্রেন চলবে। ব্রডগেজ এবং মিটারগেজ দুই রকম লাইন বসানো হচ্ছে যার উপর যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন অনায়াসে চলাচল করতে পারবে। সেতুর দ্বিতলে থাকছে সড়কপথ যেখানে ৪টি লেন থাকবে। প্রসংগত: দৈর্ঘ্যরে দিকে থেকে এটি পৃথিবীর ১১তম সেতু। বিশে^ দীর্ঘতম সেতু হিসেবে গিনেস বুকে নাম লিখিয়েছে চীনের জিয়াংসু প্রদেশে অবস্থিত ড্যানইয়াং কুনসান গ্রান্ড ব্রীজ। সেতুটি ১৬৪.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। সেতুটি ২০১১ সালে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এ সেতু নির্মানে ব্যয় হয়েছে ৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
পদ্মা সেতু নির্মানে বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে নির্মান সামগ্রী ও নানা ধরনের সাজ-সরঞ্জাম আনা হয়েছে। সেতুর পাথর আনা হয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ড থেকে যার এক একটির ওজন প্রায় এক টন। কংক্রীট আনা হয়েছে ভিয়েতনাম থেকে। স্প্যানগুলি আনা হয়েছে চীন থেকে। মাইক্রোফাইন (অতি মিহি) সিমেন্ট আনা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। সবচেয়ে বড় আকর্ষনীয় সরঞ্জাম বিশে^র সেরা ৩ হাজার কিলোজুল ক্ষমতা সম্পন্ন হ্যামার আনা হয়েছে জার্মানী থেকে। তৈরী পাইল আনা হয়েছে চীনের ন্যানটং ওয়ার্কসপ থেকে। অত্যাধুনিক ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার এবং পাওয়াফুল ক্রেনসহ ভারী যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে চীন থেকে। করোনার মধ্যেও আগাগোড়া প্রতিদিন প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানসহ প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোক সেতুর নির্মান কাজ করেছেন। আয়োজন যেখানে এত বিশাল, প্রকল্প যেখানে এত বিরাট সেখানে যথেষ্ট অর্থ ব্যয় তো হবেই। অথচ বিরোধী দলের কোনো কোনো নেতা এমনভাবে কথা বলছেন তাতে মনে হয় ত্রিশের মধ্যে বিশ হাজার কোটি টাকাই চুরি এবং পাচার হয়ে গেছে। এ সমস্ত কথাবার্তা আন্দাজের উপর এবং পরিসংখ্যান ভিত্তিক নয় বলে মনে হয়।
পদ্মা সেতুর অতীত বর্তমান বিশ্লেষণ করলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু না হলে যেমন দেশ স্বাধীন হতো না। ঠিক তেমনই শেখ হাসিনা না হলে পদ্মা সেতু হতো না। এ কাজে আর একটা বিষয় স্পষ্ট হয়। সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রচিত্ত আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগিয়ে গেলে কাজ যত কঠিনই হোক না কেন অর্থের জন্য তা আটকায় না। এখন মনে হচ্ছে বিশ^ব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করা আমাদের জন্য সাপে বর হয়েছে। শত প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে বিপক্ষকে পরাভুত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ এ সেতু উদ্বোধন করছেন। দক্ষিণবঙ্গের আপামর জনতার পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও ঐকান্তিক কৃতজ্ঞতা। প্রসংগত: উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন-“প্রতিটি জেলায় রেল লাইন যাবে। প্রতিটি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ হবে। বাংলাদেশের কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না।” পদ্মা সেতুর মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই স্বপ্নগুলোও যেন বাস্তবায়িত হয়। এ কাজগুলো সম্পন্ন করার তৈফিক যেন রাব্বুল আলামিন তাকে দেন। অন্তত ততদিন যেন আল্লাহ্ তার নেক হায়াত দারাজ করেন, এটাই আমার ঐকান্তিক কামনা। আমিন।
লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা।
ইমেইল-mahmudhossain000069@gmail.com

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষঃ