সোমবার, ১৫ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

বালাগঞ্জে দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী, খাদ্য সংকট চরমে

আ.হ ইমন শাহ্ (সিলেট):
ভারী বর্ষণ ও ভারতীয় ঢলের পানিতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার শতভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। অর্ধাহারে-অনাহারে থাকা বানভাসি মানুষের মধ্যে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বেসরকারি তথ্যমতে, উপজেলা প্রশাসন ঘোষিত আশ্রয় কেন্দ্র ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে কয়েক সহস্রাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন উঁচু বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছেন আরো সহস্রাধিক পরিবার। আশ্রয়ন কেন্দ্রগুলোতে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু, গর্ভবর্তী নারী, নবজাতক ও অনেক প্রসূতি নারী রয়েছেন। পানিবন্দী লোকজন চরম খাদ্য সংকট ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছেন। সরকারি-বেসরকারিভাবে এখনও কোনো ধরণের ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তারা। এই মুহূর্তে শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এমন দুর্বিসহ পরিস্থিতিতে বালাগঞ্জকে বন্যাদুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি ওঠেছে। বালাগঞ্জ সরকারি কলেজের দু’তলায় আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় শতাধিক পরিবার। কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, রবিবার সিলেট-৩ আসনের এমপি হাবিবুর রহমান হাবিবের উপস্থিতিতে কলেজের আশ্রয় কেন্দ্রে মাত্র ৬টি পরিবারকে শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। এবিষয়টি নিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করতে দেখা গেছে। শুক্রবার রাতে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তলিয়ে যাওয়া বালাগঞ্জ বাজারে এখন গলা ও বুক সমান পানি। শুক্রবার থেকে বন্ধ রয়েছে বাজারের সব দোকানপাট। বন্যার পানিতে নদী আর বাজার একাকার হয়ে গেছে। শনিবার সকাল থেকে পানি বৃদ্ধি পেয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডুবে গেছে উপজেলা প্রশাসনিক ভবন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের নিচতলা। বন্যা আক্রান্ত হয়েছে বালাগঞ্জ বাজারের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় থাকা সরকারি খাদ্য গুদাম। তলিয়ে গেছে উপজেলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়। ছোট-বড় সব বাজারের উপর দিয়ে পানির প্রবল স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী তাদের দোকানের মালামাল নিরাপদে সরিয়ে নিতে পারেন নি। ডুবতে বাকি নেই পাড়া-মহল্লার মুদির দোকানগুলোও। এতে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বানভাসি মানুষের বেঁচে থাকতে এখন শুকনো খাবারই ভরসা। তারা ত্রাণের অপেক্ষায়। বন্যার খোঁজ-খবর নিতে গেলে অনেকেই বলছেন ত্রাণের নৌকা কত দূর?। উপজেলার কয়েক সহস্রাধিক পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে গেছে। যার ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। বন্যাদুর্গত দু-একটি এলাকায় ত্রাণ হিসেবে নাম মাত্র কিছু চাল দিয়ে ফটোসেশন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাল রান্না করার ব্যবস্থা না থাকায় বানভাসি লোকজন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলছেন, বন্যার এই দুর্যোগে ত্রাণের নামে চাল দেয়া তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। এদিকে, গবাদি পশুর খাদ্য সংকটে মানুষ আরো বিপাকে পড়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্র ও আক্রান্ত এলাকায় অনেকেই গরু, ভেড়া-ছাগল, হাঁস-মোরগ নিয়ে এক ঘরেই বসবাস করতে দেখা গেছে। তিন সপ্তাহের আগের বন্যায় এ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছিল। এত কম সময়ে এবার পুরো উপজেলা প্লাবিত হবেÑ এমনটি কেউ ভাবেন নি। শনিবার সকাল থেকে রাতের মধ্যেই উপজেলার বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অঝোর ধারায় বিরামহীন বৃষ্টিতে হু-হু করে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমেই তলিয়ে গেছে উপজেলার সাথে যোগাযোগ রক্ষাকারী প্রধান সড়কগুলো। ১৮দিন টানা ভারী বর্ষণের পর ২১জুন রোদের দেখা পেয়ে মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছে।
পানিবন্দী লোকজন বলছেন, দেড় মাস ধরে টানা বর্ষণের কারণে ঘরে ধান থাকলেও শুকাতে বা ভাঙাতে পারেন নি। চুলা ধরানোর লাকড়িও ঘরে নেই। এলপিজি গ্যাস ব্যবহারকারীদের সিলিন্ডারের গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ায় গ্যাস ক্রয় করা সম্ভব না হওয়ায় চুলায় আগুন জ্বলছে না। এতে তারা চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। বানভাসি মানুষের অভিযোগ, সিলেট বিভাগ অঞ্চলে দফায়-দফায় হানা দিচ্ছে বন্যা। এবারের বন্যা ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। আগ থেকে ভাবা উচিৎ ছিল যে কোনো সময় আমরা এধনের পরিস্থিতির শিকার হতে পারি। কিন্ত এরপরও উপজেলা প্রশাসনের কোনো ধরণের পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। এখন এই অবস্থা হয়েছে পানিও বাড়ছে আমাদেরকে না খেয়ে মরতে হবে।
উপজেলার দূরবর্তী নিম্নাঞ্চলগুলোর বন্যা আক্রান্ত লোকজন বলেন, ভোট আসলে আমরা ভোট ঠিকই দেই। এখন পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধির দেখা পাচ্ছি না। উপজেলা প্রশাসনের লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে তাদের যাতায়াত সুবিধা এমন এলাকা পরিদর্শনে যাচ্ছেন। তারা নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে লোক দেখানো শুকনো খাবার বিতরণের নামে ফটোসেশনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। যারা যৎ সামান্য ত্রাণ পাচ্ছে তারা বারবার পাচ্ছে, কিন্তু আমাদের দেখতে কেউ আসছে না।
এদিকে, বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি এবং বেসরকারি তথ্যের অনেক ফারাক রয়েছে। শতভাগ এলাকা প্লাবিত হলেও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন ৯০ভাগ এলাকা। কয়টি আশ্রয় কেন্দ্রে কতোটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে সেটির সঠিক তথ্যও নেই।
বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোজিনা আক্তারকে কয়েকবার কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রীতি ভূষণ দাস বলেছেন, সরকারি তথ্যমতে উপজেলার ৮০-৯০ ভাগ প্লাবিত হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে উঠেছেন সাড়ে ৪শ পরিবারের প্রায় দুই হাজার মানুষ। নগদ ৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ২ লক্ষ টাকায় ৯শ মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। আরো শুকনো খাবার প্যাকেট করা হচ্ছে। ২৩টন চাল এসেছে দু’এক দিনের মধ্যে আরো ৯টন আসবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষঃ