সোমবার, ২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

মুজিব অবিনশ্বর

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের কথা। পৃথিবীর বহুদেশ তখনও পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। ইংরেজদের দখলে পুরো ভারতবর্ষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। ভারতবর্ষের অজানা ও নিভৃত প্রত্যন্ত গ্রাম, নাম টুঙ্গিপাড়া, যে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মধুমতী নদী। প্রত্যন্ত এই গ্রামে যে শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, একসময় সে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, তার নাম ও যশ ছড়িয়ে পড়বে দূর-দূরান্তেÍ এতটুকু স্বপ্ন হয়তো বা তার গর্বিত পিতা-মাতার ছিল। অজানা আশঙ্কা থাকাও অসম্ভব ছিল না। পরাধীন দেশে মানুষের স্বপ্ন কতটুকুই বা পূর্ণতা পায়। আর দূর-দূরান্তে যশ ছড়িয়ে পড়া! সে কত দূরকে বোঝাবে? আজ থেকে ৯৮ বছর আগে ১৯২০ সালে এই অঞ্চলে যখন ঢাকা শহর থেকে দূরের এমন অনেক গ্রাম আছে, যেখানে যেতেই দুই-তিন দিনের মতো সময় লেগে যেত, তখন এই সীমানার মধ্যে বড়ো হওয়াটা স্বপ্নেরও অতীত। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ সায়েরা খাতুনের ঘর আলোকিত করে যে ফুটফুটে ছেলের জন্ম হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রথম পুত্রসন্তান, মা-বাবার অনাবিল আনন্দ, শেখ পরিবারের নতুন অতিথিÑ সবাই আদর করে নাম রেখেছিলেন খোকা। ১৯২৭ সালে খোকা গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন, যখন তার বয়স সাত বছর। ১৯২৯ সালে ৯ বছর বয়সে খোকা গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখানেই ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। চোখে জটিল রোগের সার্জারির কারণে ১৯৩৪ থেকে চার বছর তিনি বিদ্যালয়ের পাঠ চালিয়ে যেতে পারেননি। ১৯৪১ সালে তিনি গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, তারপর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৪ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ এবং একই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে বিএ পাস করেন। ভারত বিভাগের পর তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আইন বিভাগে অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। তবে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। কারণ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার প্রতি বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ঔদাসীন্যের বিরুদ্ধে তাদের বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ১৯৪৯ সালের প্রথমদিকে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। স্কুলজীবন থেকেই শেখ মুজিবের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলির বিকাশ ঘটেছিল। তিনি যখন গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলের ছাত্র, সেসময় ১৯৩৯ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক ওই স্কুল পরিদর্শনে আসেন। ওই অঞ্চলের অনুন্নত অবস্থার প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কিশোর মুজিব বিক্ষোভ সংগঠিত করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় কর্মী এবং ১৯৪৩ সাল থেকে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। রাজনীতিতে তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একনিষ্ঠ অনুসারী। ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে ফরিদপুর জেলায় দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা হোটেলে পূর্ব পাকিস্তানের পরবর্তী কর্তব্য নির্ধারণে সমবেত হয়েছিলেন কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক কর্মী। সেখানে পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক ভাবধারার রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক যুবলীগের কর্মী সম্মেলনে ভাষাবিষয়ক কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করেছিলেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে, তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের ওপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত আন্দোলনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমেই তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতার সূচনা ঘটে। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনে প্রধান সংগঠকদের একজন ছিলেন শেখ মুজিব। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন গণপরিষদের অধিবেশনে প্রদত্ত বক্তব্যে বলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তার এই বক্তব্যে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদী শেখ মুজিব অবিলম্বে মুসলিম লীগের এই পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরুর সিদ্ধান্ত নেন। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানের স্রষ্টা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তাঁর মৃত্যুর পরে কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব তাঁর মনে যুগপৎ হতাশা ও স্বপ্ন তৈরি করেছিল। শেখ মুজিব বরাবর আত্মপ্রত্যয়ী এবং কখনো হাল ছাড়ার পাত্র নন। দুটি বিষয় তিনি তখনই উপলব্ধি করেছিলেনÑ পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালির ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং মুসলিম লীগ বাঙালির ভবিষ্যৎ নির্মাণের উপযুক্ত রাজনৈতিক দল নয়। ফলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সামনে রেখে ১৯৪৯ সালেই প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী দল মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তরুণ শেখ মুজিব দলের সামনের কাতারে বর্ষীয়ান নেতাদের রাখলেও এর চালিকাশক্তি যে তিনিই ছিলেন, তা পরবর্তী ঘটনাবলি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। ১৯৪৮ সালে ভাষার প্রশ্নে তাঁর নেতৃত্বেই প্রথম প্রতিবাদ এবং ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয়, যা চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে। শেখ মুজিব ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দিদের একজন। কারাগার থেকে পরপর তিনদিন তিনি ভাষা আন্দোলন দমনের প্রতিবাদে বিবৃতি দেন। বায়ান্নর ঘটনাবলির পরে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রদেশের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। ক্রমে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে ডিঙিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা জোরদার হয়। এই প্রবণতার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ পূর্ববঙ্গ থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। তখন থেকেই প্রদেশে ধর্মের পরিবর্তে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের একচ্ছত্র বিকাশ নিশ্চিত হয়। মুজিব ও তাঁর অনুসারীরা তখনই দল থেকে সাম্প্রদায়িক পরিচয় মুছে দিলেন। আওয়ামী লীগ তখন পুরোপুরি সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দলে পরিণত হয়। ১৯৫৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষার প্রশ্নে তাঁর প্রদত্ত ভাষণ ছিল উল্লেখযোগ্য। মাতৃভাষায় বক্তব্য রাখার অধিকার দাবি করে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখানে বাংলায় কথা বলতে চাই। আমরা অন্য কোনো ভাষা জানি কি জানি না, তাতে কিছুই যায় আসে না। যদি মনে হয় আমরা বাংলাতে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি, তাহলে ইংরেজিতে কথা বলতে পারা সত্ত্বেও আমরা সব সময় বাংলাতেই কথা বলব। যদি বাংলায় কথা বলতে দেওয়া না হয়, তাহলে আমরা পরিষদ থেকে বেরিয়ে যাব। কিন্তু পরিষদে বাংলায় কথা বলতে দিতে হবে। এটাই আমাদের দাবি।’

১৯৫৬ সাল। সোহরাওয়ার্দী তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী। পূর্ব পাকিস্তানে এসেছেন সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তানের নেতারা। অনেকেই উর্দুভাষী। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কার্জন হলে তাঁদের সম্মানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সংগীত, নাটক, নৃত্য ভালোই হলো। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান বলে বসলেন, “এত নাটক হলো, গান হলো; কিন্তু তোমরা ‘আমার সোনার বাংলা’ শোনাবা না?” শিল্পীরা আবার মঞ্চে উঠলেন। সবাই মিলে গান ধরলেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন অব্যাহত ছিল। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অনুমোদনের মাধ্যমে এই আন্দোলন তার লক্ষ্য অর্জন করে। বস্তুত জেলে অন্তরিন থাকা অবস্থায় নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদকের তিনটি পদের মধ্যে একটিতে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। পঞ্চাশের দশক তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের কাল। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেন দূরদর্শী এক রাজনৈতিক নেতা। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম লীগ ছেড়ে দেন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর সঙ্গে মিলে গঠন করেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। তিনি দলের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃষিমন্ত্রী এবং ১৯৫৬ সালে কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাজে পুরোপুরি আত্মনিয়োগের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের মন্ত্রিসভা থেকে নয় মাস পর ইস্তফা দেন। ষাটের দশকে সারা বিশে^র মতো দেশের ছাত্র-তরুণ, শিল্পী-সাহিত্যিক, শিক্ষক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বামপন্থার দিকে ঝোঁক বেড়েছিল। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের মধ্যে তখন এই ধারার প্রভাব বেড়ে যায়। শোষণ-বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও সব সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এই ধারায় যে রাজনীতি, এর সঙ্গে শেখ মুজিব তাঁর জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে যুক্ত করতে সক্ষম হন। ১৯৬৪ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের শাসনামলে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার মতো সাহসিকতা দেখিয়েছেন শেখ মুজিব, পাকিস্তান ধারণাটির ব্যাপারে ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধুর মোহমুক্তি ঘটেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের মনোভাবের মধ্যে সমতা ও সৌভ্রাতৃত্ববোধ ছিল না। ১৯৬৬ সালেই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর একটি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে পাকিস্তানে বাংলার মানুষের এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তিনি তাঁর বিখ্যাত ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং এই ছয় দফাকে আখ্যায়িত করেন বাঙালির ‘মুক্তি সনদ’রূপে। দফাগুলো হলো: ১. ফেডারেল রাষ্ট্র গঠন এবং সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন; ২. প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ব্যতীত অপর সব বিষয় প্রাদেশিক সরকারগুলোর হাতে ন্যস্ত করা; ৩. দুই রাষ্ট্রের জন্য পৃথক মুদ্রা চালু করা অথবা পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; ৪. করারোপের সব ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারগুলোর হাতে ন্যস্ত করা; ৫. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোকে স্বাধীনতা প্রদান; ৬. রাষ্ট্রগুলোকে নিজের নিরাপত্তার জন্য মিলিশিয়া বা আধা সামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা প্রদান করা। সংক্ষেপে এ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজনীতির প্রতি তাঁর এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, ছয় দফা কর্মসূচির অর্থ ছিল কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বাধীনতা। সব রাজনৈতিক দলের রক্ষণশীল সদস্যরা এ কর্মসূচিকে আতঙ্কের চোখে দেখলেও এটা তরুণ প্রজন্ম বিশেষত ছাত্র, যুবক ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে নতুন জাগরণের সৃষ্টি করে। ছয় দফা কর্মসূচির চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার পর আইয়ুব সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করে। শেখ মুজিবসহ আরও ৩৪ জনের বিরুদ্ধে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে একটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ঢাকা কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির বিচার চলছিল, যেটা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পাকিস্তানের আধিপত্যবাদী মনোভাবের বিরুদ্ধে বাঙালিদের আবেগ-অনুভূতিকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। ১৯৬৯ সালের প্রথমদিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে গণআন্দোলন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যে, আইয়ুব সরকার দেশে আসন্ন একটি গৃহযুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টায় মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়। শেখ মুজিব ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নিঃশর্ত মুক্তিলাভ করেন। মুক্তির পরদিন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রমনার রেসকোর্সে তাঁর সম্মানে গণসংবর্ধনার আয়োজন করে। সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে পরিষদের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। উনসত্তরের বিশাল গণআন্দোলনে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন হলো। গণঅভ্যুত্থানের পরে বঙ্গবন্ধু জনগণের আস্থাভাজন প্রিয়নেতা এবং সবাইকে ছাপিয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, এই জনপদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী মহানায়ক। এই সময়ে তাঁর নেতৃত্বে দেশের মানুষ কাতারবন্দি হতে থাকে। তিনি মাঠপর্যায়ের তখনকার সময়ের শক্তিশালী প্রগতিশীল বামধারার রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী, ছাত্র-তরুণ ও শিল্পী-বুদ্ধিজীবীসহ অধিকাংশের আস্থা অর্জনে সক্ষম হন। তিনি সত্তরের নির্বাচনকে নিলেন তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার পক্ষে গণভোট হিসেবে। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টির মধ্যে ৩০৫টি আসন লাভ করে। ব্যালটে তিনি এমন অভাবিত বিজয় অর্জন করলেন, যখন পাকিস্তানিদের বুলেট, ট্যাংক, কামান সবই তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। এ নির্বাচনে বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার প্রতি সমর্থন জানিয়ে তাঁকে অভূতপূর্ব বিজয় উপহার দিয়েছিল। বাঙালিরা প্রথমবার এই দেশের শাসনভার গ্রহণ করবে, পাকিস্তানি মিলিটারির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ১৯৭১ সাল। ৩ জানুয়ারি। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জনসভা। বঙ্গবন্ধু সদ্যনির্বাচিত জাতীয় পরিষদের সদস্যদের শপথ করালেন, কেউই ছয় দফা থেকে এক অক্ষরও সরবে না, সরতে পারবে না। সভার শেষে দুটো গান পরিবেশিত হয়। ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ আর ‘আমার সোনার বাংলা’। এমএ ওয়াজেদ মিয়া তাঁর বইয়ে লিখেছেন, “সেদিন রাতে খেতে বসে বঙ্গবন্ধু একপর্যায়ে গম্ভীর হয়ে আমাদের উদ্দেশ করে বললেন, ‘দেশটা যদি কোনোদিন স্বাধীন হয়, তাহলে দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে কবিগুরুর ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটিকে গ্রহণ করো।” ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানের জনসভায় স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে গ্রহণ করার কথা ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে গাওয়া হয়। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। বঙ্গবন্ধু ‘সোনার বাংলা’ শব্দবন্ধটি তুলে নিয়েছিলেন এই গান থেকে। সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন তিনি দেখতেন, এই স্বপ্নে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন দেশবাসীকে। ১৯৭০ এর নির্বাচনের আগে পোস্টার করা হয়েছিল, ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’। স্বাধীনতার পর তিনি বলতেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই।’ চলবে…

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষঃ