সোমবার, ১৫ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে, যে পরামর্শ বিশ্লেষকদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে আমদানি ব্যয়। এতে প্রতিনিয়তই কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। গত বছরের এ সময়ে দেশের যে রিজার্ভ ছিল, তা দিয়ে ৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন বা ৪ হাজার কোটি ডলারের নিচে নেমে (৩৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন) এসেছে। এ রিজার্ভ দিয়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।এরই মধ্যে রিজার্ভ ধরে রাখতে নানামুখী সংস্কার এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খোলার ২৪ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানোর পাশাপাশি রপ্তানিকারকের রিটেনশন বা প্রত্যাবাসন কোটা (ইআরকিউ) হিসাবে জমা করা বিদেশি মুদ্রার ৫০ শতাংশ নগদায়ন করা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এক্ষেত্রে আরও কঠোর হওয়ার সুযোগ আছে। রপ্তানির সঙ্গে রেমিট্যান্সকেও বাড়াতে হবে। বিশেষ প্রয়োজনীয় পণ্য না হলে আমদানি বন্ধ করতে হবে। এসব না করতে পারলে পরিস্থিতি আরও (ক্রিটিক্যাল) খারাপের দিকে যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে রিজার্ভ। বেশকিছু পদক্ষেপের কারণে রিজার্ভ ভালো অবস্থানে যাবে।সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সংকট দেখা দিয়েছে। বিলাসবহুল এবং অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে নিরুৎসাহিত করতে সরকার একটা পদক্ষেপ নিয়েছে। এরপরও ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও রেমিট্যান্স কমে আসায় ডলারের এ সংকট। এতে রপ্তানি আয় বাড়লেও ডলারের সংকট কাটছে না। এতে রিজার্ভ থেকে ডলার ছেড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এসব কারণে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৩৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে ডলারের জোগান বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ‘ব্যাংকগুলো তাদের আমদানির খরচ মেটাতে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে ঋণ নিতে পারবে। আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ২৪ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। রপ্তানিকারকের রিটেনশন বা প্রত্যাবাসন কোটা (ইআরকিউ) হিসাবে জমা করা বিদেশি মুদ্রার ৫০ শতাংশ নগদায়ন করতে হবে।’কাগজে-কলমে রিজার্ভ এখন প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বা ৩৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এ হিসাব নিয়ে আছে বিতর্ক। বলা হচ্ছে— প্রকৃত রিজার্ভের অংক ৩২ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভের অংক নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আইএমএফ যুক্তি হচ্ছে— বর্তমানে রিজার্ভের অর্থে রফতানি উন্নয়ন তহবিলে (ইডিএফ) ৭০০ কোটি, জিটিএফে ২০ কোটি, এলটিএফএফে ৩ কোটি ৮৫ লাখ এবং সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে পায়রাবন্দর কর্তৃপক্ষকে ৬৪ কোটি ডলার ও বাংলাদেশ বিমানকে ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছে। এ ৭৯২ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের বাইরে কারেন্সি সোয়াপের আওতায় শ্রীলঙ্কাকে দেওয়া হয়েছে ২০ কোটি ডলার। এটা রিজার্ভ থেকে বাদ দিলে প্রকৃত রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসবে।

অন্যদিকে, প্রতিনিয়ত রিজার্ভ কমে যাওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ। এক বছর আগে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড অবস্থায় ছিল। কিন্তু এখন সেই অবস্থানে নেই। গত বছরের এ সময়ে যে রিজার্ভ ছিল তা দিয়ে ৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হলেও বর্তমান সময়ে তা কমে হয়েছে চার মাসের। মূলত আমদানি ব্যয় মেটাতেই শেষ হচ্ছে রিজার্ভ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সতর্ক না হলে অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নকে (এসিইউ) আমদানির অর্থ পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে গেছে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘রিজার্ভ দিয়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যায় এমন রিজার্ভ থাকলে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। যদিও সেখানে কিছুটা ঝুঁকি থাকে। আমাদের কয়েক মাস পরে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নকে (এসিইউ) আমদানির অর্থ পরিশোধ করতে হবে, সেখানে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের মতো চলে যাবে। একটা ক্রিটিক্যাল অবস্থা তৈরি হতে পারে। কাজেই এখন চেষ্টা করতে হবে রপ্তানি বাড়ানো আমদানি ব্যয় কমোনার। বিশেষ প্রয়োজনীয় না সেব পণ্য আমদানি বন্ধ করতে হবে। বেশ কিছু দিন ধরে রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রেমিট্যান্সকে আমরা গুরুত্ব মনেকরি, কারণ এ টাকাটা আমাদের রিজার্ভ এ যোগ হয়। রেমিট্যান্সটাকে বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।’ডলারের সংকট মেটাতে রিজার্ভ থেকে ডলার ছেড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিনিয়ত দামও বাড়ছে ডলারের, এর বিপরীতে দুর্বল হচ্ছে টাকা। রিজার্ভ ধরে রাখতে তাই নানামুখী সংস্কার এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়নি এমনটাই বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, রিজার্ভ দিয়ে তিন মাস পর্যন্ত আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হলে, তখন পর্যন্ত শঙ্কা থাকে না। আমাদের রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে নানা পদক্ষে নিয়েছে। ডলারের বাজার স্বাভাবিক রাখতে বিলাসবহুল পণ্য আমদানি আরও কঠোর করা হয়েছে। এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলার সময় ব্যাংকগুলোকে আমদানিকারকদের কাছ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম অর্থ নিতে পারবে। ব্যাংকগুলো এখন তাদের আমদানির খরচ মেটাতে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে ঋণ নিতে পারবে। আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ২৪ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে এবং রপ্তানিকারকের রিটেনশন বা প্রত্যাবাসন কোটা (ইআরকিউ) হিসাবে জমা করা বিদেশি মুদ্রার ৫০ শতাংশ অনতিবিলম্বে নগদায়ন করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষঃ