সোমবার, ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

৪৩ বছর পুরনো ছবি নিয়ে স্মৃতিচারণা

মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল

১৯৭৯ সালের ২২ জুন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় কোন ঘটনা না ঘটলেও একজনের জীবনে দিনটি মনের মণিকোঠায় ঠাই করে নিয়েছে। ১৬ বছর বয়সের সেই টগবগে কিশোর মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম খান (রফিক খান) এখন ৬০ বছরে সিনিয়র নাগরিক হওয়ার দোড়গোড়ায় দাড়িয়ে। তৎকালীন স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই সংসদ ভবন ঘেরাও ও বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। সেখানে রফিক খানের অংশ নেওয়াটা ছিলো কৈশোর বয়সের বড় একটি স্বপ্ন। মিছিলে অংশগ্রহন করার বড় অথচ ’ঝুকিপূর্ণ’ আশা নিয়ে নিজ বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জ থেকে ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতিত নেন। এখনকার মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটা ভাল ছিলনা সে সময়। ঢাকায় আসার জন্য সম্ভল হিসেবে ছিল দুই একটা ট্রেন। তাও আবার কালীগঞ্জের আড়িখোলা স্টেশনে সব ট্রেন যাত্রাবিরতি করতো না। প্রথম মেইল ট্রেন দিয়ে নরসিংদী জংশনে চলে যান তিনি। সেখান থেকে বাসে করে ঢাকার গুলিস্তানে যান আরও কয়েকজনের সাথে।

বর্তমান সময়ের চেয়ে তুলনামূলক কম জনসংখ্যার রাজধানী ঢাকাতে গিয়ে যেন শরীরে অন্যরকম একটা অনুভুতি কাজ করে। গুলিস্তানে বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটে বায়তুল মোকারমের সামনে মিছিলে অংশগ্রহন করেন রফিক খান। যেটা ছিল তার মত কৈশোরের জন্য বিশাল স্বপ্ন হাতের মুঠোয় পাওয়ার সামিল। চারিদিক স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল একটা অবস্থা বিরাজ করছিল। ’রাষ্ট্রপতি জিয়ার গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে, পাকিস্তানের জিয়া পাকিস্তানে চলে যা’, শ্লোগান আর মিছিলে রাজপথ দখলে নেয় আওয়ামীলীগ।। সে কি গগনবিদারী আওয়াজ যেন রক্তে আগুন স্ফু্লঙ্গি জ্বলে উঠল, হাজারো যুবকের সঙ্গে রফিক খানও সেদিন মিছিলে ঝাপিয়ে পড়েন।

তৎকালীন আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল মালেক উকিল, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে মিছিলের সামনের সাড়িতে ছিলেন রফিক খান। শুরুতে বাধাঁর মুখে না পড়লেও বাংলা মটরে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রফিক খান বলেন, ’বাংলা মটরে প্রথমে আমরা ব্যারিকেড ভাঙ্গি, আমরা যখন মিছিল নিয়ে সেখানে পৌঁছাই তখন শুরু হয় আমাদের উপর বৃষ্টির মত গুলি, কাঁদানী গ্যাস ও বেপড়োয়া লাঠিচার্জ করা’। তিনি আরও বলেন, ’এরপর আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। ঐ সময় আমাদের সভাপতি মরহুম আব্দ্লু মালেক উকিল সাহেবের শাহাদাত আঙ্গুলটি ভেঙ্গে যায়। সেই দিনের কথা মনে হলে আজো চোখের কোনে পানি চলে আসে। তবে একটা কথা ভাবলে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে, আমি সেদিনের মিছিলে একজন ছিলাম’।

১৯৬২ সালের জানুয়ারিতে গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার ফুলদিতে বাবা মহসনি খান ও মা সৈয়দা আছিয়া বেগমের সম্ভ্রান্ত মুসলিম ঘরে জন্ম রফিক খানের। নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার হাতেখরি তার। এরপর একই গ্রামের জনতা উচ্চ বিদ্যালয় ফুলদী থেকে এসএসসি পাশ করার পর সরকারি তিতুমির কলেজ থেকে ডিগ্রি পাশ করেন তিনি। জনতা হাই স্কুলে পড়ার সময়ই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে হাতে খরি হয় তার। ছাত্রলীগের স্কুল কমিটির সভাপতি হওয়ার পর কালিগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হন তিনি। সেই কমিটির আহবায়ক ছিলেন বাসুদেব গোপ, যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ, গাজী সারোয়ার হোসেন, কবির হায়দার, আজাদ আনোয়ার। সেই কমিটি ঘোষনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রয়াত আবু জাফর শামসুদ্দিন (প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক)। পরবর্তীতে সম্মেলনের মাধ্যমে কালীগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করেন রফিক খান।

এরপর সরকারি তিতুমির কলেজের তদানীন্তন ছাত্র সংসদের ছাত্রলীগ হতে একমাত্র নির্বাচিত সদস্য হন তিনি। পরবর্তীতে স্বৈরাচার জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে নিজেকে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় রাখেন। ২০০৩ সালে কালীগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ কৃষকলীগের জাতীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৫ সালে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন রফিক খান। এরপর কৃষকলীগের জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পর কালীগঞ্জের সংসদ সদস্য মেহের আফরোজ চুমকির নির্দেশনায় তাকে বক্তারপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এরপর থেকে এলাকার সার্বক্ষণিক সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তিনি। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় তিনি ব্যক্তিগত তহবিল হতে বক্তারপুর ইউনিয়নে প্রচুর সাহায্য সহযোগিতা করেন। যা সারা ইউনিয়নব্যপী সমাদৃত।

রফিক খানের বাবা মরহুম মোহাম্মদ মহসিন খান বক্তারপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে বৃহত্তর ঢাকা বিভাগের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে পদত্যাগ করে নিজেকে স্বাধীনতা যুদ্ধে সামিল করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রফিক খানদের বাড়ি পাক হানাদার বাহিনী পুড়িয়ে ফেলে। রফিক খানের বাবা এর আগে ১৯৬৮ সালে নিজ গ্রামে জনতা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে রফিক খান বলেন, ’এখন আমি আমৃত্যু এলাকাকে সুদ, মাদক ও জুয়ামুক্ত সুন্দর সুশৃঙ্খল আদর্শ সমাজ গঠনে মেহের আফরোজ চুমকি আপার নির্দেশে কাজ করে যেতে চাই’।

৫ ভাই ৩ বোনের মধ্যে তৃতীয় রফিক খান। ব্যক্তিজীবনে ২ মেয়ে ১ ছেলে, স্ত্রী সৈয়দা তামান্না বেগমকে নিয়ে সুখের সংসার। স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বড় মেয়ে রাঈসা মুনজেরিন চিকিৎসক হিসেবে (জেনারেল সার্জন বিসিএস) এবং ছোট মেয়ে তানজীম তানিসা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে বেলজিয়ামের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত রয়েছেন। একমাত্র ছেলে মোহাম্মদ শাফায়াত খান স্কলাসটিকা স্কুল হতে এ লেভেল সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য অপেক্ষা করছেন। ব্যক্তিজীবনে ভ্রমনপিপাসু, সময় পেলেই তিনি ভ্রমনে বেরিয়ে পড়েন। এ পর্যন্ত ২২টিরও অধিক দেশ ভ্রমন করেছেন।

বঙ্গবন্ধু ও শহীদ ময়েজউদ্দিনের আদর্শকে মনে প্রাণে ধারণ করে রফিক খান একজন ধার্মিক, নির্লোভ, বিনয়ী, সদালাপী ও দানবীর হিসেবে সাধারন মানুষের মাঝে সমাদৃত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষঃ